যে ব্যারিটোন কণ্ঠে আজও জমে ওঠে তারুণ্য

মঞ্চের আলো নিভে যাওয়ার পর হঠাৎ জ্বলে ওঠা স্পটলাইট। লম্বা কোঁকড়ানো চুল আর হাতে থাকা ইলেকট্রিক গিটারের প্রথম স্ট্রোকেই গ্যালারি ফেটে পড়ে উল্লাসে। এই একটি দৃশ্য গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতে রাজত্ব করছে। তিনি ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস। অগণিত ভক্তের কাছে তিনি পরম শ্রদ্ধার ‘গুরু’। আজ ২ অক্টোবর এই কালজয়ী রকস্টারের জন্মদিন।

ছবিতে: ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস

নওগাঁয় জন্ম নিলেও জেমসের বেড়ে ওঠা রাজশাহীতে। গানের নেশা তার রক্তে মিশে ছিল ছোটবেলা থেকেই। সেই নেশার টানেই একসময় ছাড়তে হয় পরিবারের মায়া। আশ্রয় মেলে চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ে। মূলত এই আজিজ বোর্ডিং থেকেই শুরু হয় বাংলা ব্যান্ড সংগীতের এক নতুন ইতিহাস তৈরির গল্প। বাংলা ভাষায় তিনিই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে সাইকিডেলিক রক শুরু করেন। ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডের মধ্য দিয়ে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজও চলছে দুর্বার গতিতে। ১৯৮৭ সালে ‘স্টেশন রোড’ দিয়ে যাত্রা শুরু। এরপর ‘জেল থেকে বলছি’, ‘নগর বাউল’ কিংবা ‘লেইস ফিতা লেইস’ এর মতো অ্যালবামগুলো বাংলা রক মিউজিকের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেয়। পরবর্তীতে ফিলিংস নামটি বদলে যায় ‘নগর বাউল’ নামে।

জেমসের গানের সবচেয়ে বড় জাদুকরী দিক হলো এর অদ্ভুত বৈচিত্র্য। তার গানে যেমন পাওয়া যায় নাগরিক জীবনের একাকিত্ব ও বিষাদ, তেমনি থাকে বাউলের উদাসীনতা আর তারুণ্যের দ্রোহ। ‘কবিতা তুমি স্বপ্নচারিণী হয়ে খবর নিও না’, ‘বাংলাদেশ’, ‘পাগলা হাওয়া’ কিংবা ‘মা’ এর মতো গানগুলো যেন একেকটি প্রজন্মের না বলা কথার নিখুঁত প্রতিধ্বনি। ‘তারায় তারায় রটিয়ে দেবো’ গেয়ে যখন তিনি মঞ্চে দাঁড়ান, তখন সামনে থাকা হাজারো দর্শক মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার সাথে গলা মেলায়। শ্রোতাদের সাথে তার এই আত্মিক সংযোগই তাকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

শুধু বাংলাদেশের সীমানাতেই জেমস আটকে থাকেননি। বলিউডের বিশাল জগতেও তিনি নিজের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিলেন তুমুল দাপটের সাথে। ২০০৬ সালে অনুরাগ বসুর ‘গ্যাংস্টার’ সিনেমায় ‘ভিগি ভিগি’ গানটি গেয়ে তিনি পুরো উপমহাদেশে আলোড়ন তোলেন। এরপর ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’ সিনেমার ‘আলবিদা’ ও ‘রিশতে’ বা ‘ওয়ার্নিং’ সিনেমার ‘বেবাসি’ তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। বলিউডে তার গাওয়া কয়েকটি গানই সেখানে তাকে কিংবদন্তির মর্যাদা দিয়েছে।

সময়ের স্রোতে সংগীতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। নতুন নতুন ধারা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু জেমসের সেই ভরাট কণ্ঠ আর গিটারের জাদুকরী আবেদন এতটুকুও ম্লান হয়নি। দশকের পর দশক ধরে তিনি নিজের সিংহাসনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আজও তিনি মঞ্চে উঠলে তৈরি হয় এক জাদুকরী আবহ, গিটারের প্রতিটি স্ট্রোকে যেন বিদ্রোহ আর প্রেমের নতুন গল্প লেখা হয়। গান গাওয়ার পাশাপাশি গিটার বাজানোতেও তিনি দারুণ পটু। আজ এই রকস্টারের জন্মদিনে তার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা। গিটারের ঝংকার আর তার সেই ভরাট কণ্ঠ এভাবেই অনন্তকাল বেজে চলুক। শুভ জন্মদিন, গুরু!

আল শাহারিয়া

কবি, কলামিস্ট ও পরিবেশকর্মী

য়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *