আল শাহারিয়া
সাভারের বংশী নদীর তীরে যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় বসবাস করে আসছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় বেদে সম্প্রদায়। একসময় যাদের জীবনের পুরোটা জুড়েই ছিল কেবল জলের ঢেউ আর নৌকার দোলনি, আজ তারা বাধ্য হয়ে ডাঙায় স্থায়ী বসতি গড়েছেন। আধুনিকতার দাপট, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং পেশাগত সংকটে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক অসম লড়াইয়ে তারা অবতীর্ণ হয়েছেন। প্রতিনিয়ত তারা প্রান্তিক থেকে আরও প্রান্তিকতর হচ্ছেন। সাভারের নামাবাজার ব্রিজ পার হয়ে কিছুটা সামনে এগোলেই চোখে পড়ে তাদের গ্রাম। এখানেই পকয়েক হাজার বেদে পরিবারের বাস।
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, একসময় তাদের জীবন ছিল সম্পূর্ণ যাযাবর। বছরের নয়টি মাস তারা নৌকায় করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন জীবিকার সন্ধানে। বাকি তিন মাস ফিরে আসতেন সাভারের এই আদি ডেরায়। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। নদীর নাব্যতা ভয়াবহভাবে হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি দূষণ, দখল এবং নৌকায় বসবাসের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে তারা বাধ্য হয়ে স্থাবর জীবন বেছে নিয়েছেন। বংশী নদীর নাব্যতা হারানোর ফলে তাদের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী নৌকার ব্যবহার নেই বললেই চলে। নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ায় বেদেদের জীবন থেকে চিরতরে মুছে গেছে সেই পুরোনো ছন্দ। মূলত পরিবেশগত বিপর্যয় আর অপরিকল্পিত নগরায়ন তাদের দীর্ঘদিনের যাযাবর জীবনকে একেবারে শিকড়হীন করে ফেলেছে।
ডাঙায় ফিরলেও তাদের জীবনমান উন্নত হয়নি। দুর্গন্ধে ভরা বংশী নদীর পাড় ঘেঁষে তাদের স্থায়ী ও অস্থায়ী বসতিগুলো গড়ে উঠেছে। যাদের আর্থিক অবস্থা কিছুটা ভালো, তারা কংক্রিটের ছাদওয়ালা বাড়ি করতে পেরেছেন। কিন্তু অনেক পরিবারই বাস করছে অস্বাস্থ্যকর অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘরে। এক একটি ছোট এবং স্যাঁতসেঁতে ঘরে গাদাগাদি করে থাকছেন পরিবারের পাঁচ থেকে ছয়জন সদস্য। এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশা আর বিশুদ্ধ পানির তীব্র অভাব তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। ভূগর্ভস্থ যে পানি তারা ব্যবহার করছেন, তা আদৌ স্বাস্থ্যসম্মত বা পানযোগ্য কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। দীর্ঘদিনের জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগলেও বেঁচে থাকার ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণে তারা এখনও সমাজের মূলধারা থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে আছেন।
বেদেদের প্রধান এবং আদি পরিচয় ছিল সাপ খেলা দেখানো, শিঙা লাগানো আর ভেষজ ওষুধ বিক্রি করা। গ্রামবাংলার হাটে-মাঠে একসময় তাদের জয়জয়কার ছিল। কিন্তু সময় এখন বদলেছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রসারে মানুষ এখন আর শিঙা লাগানো বা ঝাড়ফুঁকে খুব একটা বিশ্বাস করে না। বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে সাপের খেলাও এখন সাধারণ মানুষের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। পেশাগত এই তীব্র সংকটের কারণে পুরুষরা এখন বাধ্য হয়ে রিকশা চালানো, দিনমজুরি বা ক্ষুদ্র ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন। তবে অনেকেই যুগের সাথে তাল মেলাতে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পুরোনো পেশাকেই নতুনভাবে উপস্থাপন করে ডিজিটাল মজমা করে আয়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে, নারীদের জীবন সংগ্রাম আরও কঠিন রূপ নিয়েছে। এখন রাস্তা ধরে হেঁটে গেলে চোখে পড়ে সারিবদ্ধ বাড়ি এবং সাথে একটি করে ছোট দোকান। মূলত মহিলারাই সামলাচ্ছেন এসব দোকান। অনেকেই ফেরি করে কসমেটিকস ও ছোটখাটো তৈজসপত্র বিক্রি করছেন। পেশাগত পরিবর্তন আসলেও সংসারের ঘানি টানার মূল দায়িত্ব সেই নারীর কাঁধেই রয়ে গেছে। অনেক বেদে পরিবারে আর্থিক টানাপোড়েন এতটাই প্রকট যে, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম বাধ্য হয়ে আদি পেশা ছেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকায় মূলধারার সম্মানজনক চাকরিতেও তাদের প্রবেশের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে এক ধরনের গভীর পেশাগত শূন্যতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে এই বিশাল জনগোষ্ঠী।

সাভারের বেদে পল্লীতে এই রূপান্তরের একটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও রয়েছে, যা ৫২ বছর বয়সী বেদে জননী সোনাবানুর জীবনের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সোনাবানু প্রতিদিন সকালেই তার ঝুলি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। সারাদিন গৃহস্থ পাড়ায় ঘুরে শিঙা লাগিয়ে, দাঁতের পোকা বের করার চিকিৎসা দিয়ে আর বিভিন্ন গাছগাছালির ওষুধ বিক্রি করে সামান্য কিছু আয় করেন। তারপর আসেন নামাবাজারে। বিভিন্ন দোকানে দোকানে ফিকা(ঠার ভাষা থেকে, যা টাকা তোলাকে বোঝায়) করে আরও কিছু উপার্জনের চেষ্টা করেন। দিন শেষে সেই উপার্জনের টাকা দিয়ে বাজার করে বাড়িতে ফেরেন। এরপর শুরু হয় রান্নাবান্না ও পরিবারের সবাইকে খাওয়ানোর কাজ।
কিন্তু সোনাবানুর সন্তানরা এই পেশার সাথে যুক্ত হতে চান না। বেদে পরিচয়ে মানুষ তাদের অবজ্ঞার চোখে দেখে বলে তারা এই পেশায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তাছাড়া পরিবারের নতুন প্রজন্ম যখন আধুনিক বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছে, তখন পরিবারের অন্যদের বেদে পরিচয় কর্মক্ষেত্রে অসম্মান বয়ে আনে বলে তারা মনে করেন। ফলে পুরনো এবং নতুন, এই দুই ভিন্ন মানসিকতার সমাজ ম্যানেজ করা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোনাবানু নিজেও আর এই বৈষম্যমূলক জীবন চান না। তিনি চান একটি সাধারণ গৃহস্থ জীবন এবং স্থায়ী সম্মানজনক পেশা। এই অস্তিত্ব সংকটকে সাভারের বেদে সম্প্রদায় এখন খুব ইতিবাচকভাবেই দেখছে এবং তারা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা লালন করছে।
শিক্ষা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও চিত্রটি হতাশাজনক। বেদে পল্লীর শিশুদের শিক্ষার হার আগের চেয়ে কিছুটা বাড়লেও, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার এখনও চরম আশঙ্কাজনক। দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কষাঘাতে প্রাথমিক গণ্ডি পার হওয়ার আগেই অনেক শিশু বিভিন্ন শ্রমে বা কর্মজীবনে প্রবেশ করতে বাধ্য হচ্ছে। সামাজিক বিচারে তারা আজও ভিন্ন ধাঁচের মানুষ হিসেবেই বিবেচিত হয়। যদিও তারা এখন ভোটার হয়েছেন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন, তবুও সামাজিক মূলধারার সঙ্গে তাদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব পুরোপুরি ঘোচেনি। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কিছু ছোট উদ্যোগ থাকলেও তা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। বিশেষ করে উন্নত কারিগরি শিক্ষার অভাব তাদের সম্মানজনক কর্মসংস্থানের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান যুগে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব, যা এই জনগোষ্ঠীর নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে।
একসময় বংশী নদী ছিল বেদেদের জীবন ও জীবিকার প্রধান উৎস। এই প্রশস্ত নদী দিয়েই তারা সারা দেশে যাতায়াত করতেন। আজ নদীর দখল আর শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যের দূষণে তাদের সেই ঐতিহ্যবাহী পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে। নদীর পানি ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী এবং দেশীয় মাছও বিলুপ্তির পথে। বংশী নদীর এই মরণদশা বেদেদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে দিয়েছে। নদীর তীরে বসবাস করলেও তারা আজ নদী থেকে বিচ্ছিন্ন এক যাযাবর গোষ্ঠী। পরিবেশের এই চরম ভারসাম্যহীনতা তাদের দীর্ঘদিনের জীবনদর্শনকে এক বিশাল প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তারা না পারছে সেই পুরোনো নদীতে ফিরতে, না পারছে ডাঙার আধুনিক জীবনের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাওয়াতে।
বেদে সম্প্রদায় বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের এই অস্তিত্ব রক্ষা করা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষাকেই বুঝায়। রাষ্ট্র ও সচেতন নাগরিক সমাজের উচিত কালক্ষেপণ না করে এখনই তাদের দিকে ফলপ্রসূ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। আধুনিক বিশ্বের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তাদের মানসম্মত শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তারা সমাজের বাইরের কোনো ভিনগ্রহের বাসিন্দা নন, বরং এই বাংলারই কাদামাটির সন্তান। তাদের অন্ধকারে পিছিয়ে রেখে কোনোভাবেই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। তাই নীতিনির্ধারকদের এই বিশেষ জনগোষ্ঠীর দিকে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
বংশী নদীর তীরের এই হাজার হাজার মানুষ আজ এক চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখেমুখে এখন কেবল বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি আর হারানো দিনের দীর্ঘশ্বাস। আমরা কি পারব তাদের এই অন্ধকার গলি থেকে বের করে আধুনিক আলোর সুপ্রশস্ত পথে নিয়ে আসতে? এই প্রশ্নের উত্তরটি হয়তো লুকিয়ে আছে আমাদের সামষ্টিক সদিচ্ছা আর একটি সঠিক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ওপর। সাভারের বেদেরা ভালো নেই, তবে তাদের ভালো রাখার সুযোগ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। সময় এসেছে তাদের মূলধারায় যোগ্য সম্মান দিয়ে জায়গা করে দেওয়ার এবং নাগরিক হিসেবে তাদের প্রাপ্য অধিকারগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার। তবেই সার্থক হবে আমাদের সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়ন এবং সগৌরবে বজায় থাকবে আবহমান বাংলার হাজার বছরের বর্ণিল বৈচিত্র্য।
লেখক: আল শাহারিয়া
কবি, কলামিস্ট ও পরিবেশবাদী লেখক।
