সভ্যতার আধুনিকতম বিপ্লবী চে গুয়েভারা – আল শাহারিয়া

টি-শার্ট, পোস্টার, দেয়াললিখন কিংবা প্রতিবাদের পতাকায় এক মুখচ্ছবি বিশ্বজুড়ে তারুণ্য আর বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে আছে কয়েক দশক ধরে। দৃঢ় চোয়াল, তারাখচিত টুপি আর দূরদর্শী এক বিপ্লবী যার নাম এর্নেস্তো চে গুয়েভারা। চে আজীবন অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে এক চিরকালীন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।

চে গুয়েভারা; ছবি- সংগৃহীত

কিন্তু এই প্রতীকী চে’র আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর দর্শন, আত্মত্যাগ আর চিকিৎসকের খোলস ছেড়ে যোদ্ধ হয়ে ওঠার এক অসামান্য ইতিহাস। কীভাবে একজন আরামপ্রিয় মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, একজন শৌখিন চিকিৎসক থেকে তিনি হয়ে উঠলেন বিশ্ববিপ্লবের অন্যতম আইকন?

১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার রোসারিওয়ায় এক মধ্যবিত্ত পরিবারে এর্নেস্তো গুয়েভারার জন্ম। আইরিশ ও স্প্যানিশ বংশোদ্ভূত এই পরিবারে প্রগতিশীল চিন্তাধারার অভাব ছিল না। ছোটবেলা থেকেই হাঁপানিতে ভুগেও তার ভেতরের সত্তাটি ছিল একজন দুরন্ত অভিযাত্রীর।

ডাক্তারি পড়ার সময়েই, ১৯৫১ সালে, বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোকে সাথে নিয়ে এক জরাজীর্ণ মোটরসাইকেলে চড়ে বেরিয়ে পড়েন লাতিন আমেরিকা ভ্রমণে। নয় মাসের সেই ভ্রমণই তার জীবনের মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়।

এই ভ্রমণ কোনো সাধারণ পর্যটকের ভ্রমণ ছিল না। এটি ছিল লাতিন আমেরিকার ক্ষতবিক্ষত আত্মার সাথে তার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। স্বচক্ষে দেখা বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সীমাহীন দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অপুষ্টি ও শোষণ তার মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। তিনি চিলির খনি শ্রমিকদের অমানবিক জীবন, পেরুর কুষ্ঠ রোগীদের বিচ্ছিন্ন বসতিতে মানুষের নিদারুণ কষ্ট, এবং আমাজনের আদিবাসী মানুষদের বঞ্চনা খুব কাছ থেকে দেখেন।

এই বিশাল বৈষম্যের পেছনে দায়ী যে একচেটিয়া পুঁজিবাদ, নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নির্দয় শাসন, তা তিনি এই যাত্রায় হাড়ে মজ্জায় উপলব্ধি করেন। এই কঠিন বাস্তবতা তাকে শিখিয়ে দেয় যে মানুষের মুক্তির জন্য প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন অপরিহার্য। আর সেই পরিবর্তনের একমাত্র পথ হলো বিপ্লব।

এই বিশ্বাস থেকেই তিনি গুয়াতেমালায় রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানের সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে যোগ দেন। আরবেনজ ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু মার্কিন সংস্থা ‘ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি’-এর মতো বহুজাতিক করপোরেশনের স্বার্থে আঘাত লাগায় মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ-এর মদতে সেই গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করা হয়। চোখের সামনে এই আগ্রাসন দেখে চে’র সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা আরও দৃঢ় হয়। তিনি চূড়ান্তভাবে উপলব্ধি করেন যে, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আপসমূলক সংস্কারের কোনো স্থান নেই; একে কেবল সশস্ত্র সংগ্রামেই প্রতিহত করা সম্ভব।

এরপর মেক্সিকো সিটিতে নির্বাসিত জীবনে তার সঙ্গে পরিচয় হয় ফিদেল ও রাউল কাস্ত্রোর। সেই সাক্ষাৎই জন্ম দেয় কিউবা বিপ্লবের রূপরেখা। কাস্ত্রো ব্রাদার’দের সঙ্গে ‘ছাব্বিশে জুলাই আন্দোলন’-এ যুক্ত হয়ে চে কিউবার স্বৈরশাসক বাতিস্তার বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। চিকিৎসক হিসেবে রণক্ষেত্রে আহত যোদ্ধাদের সেবা করার পাশাপাশি তিনি হয়ে ওঠেন একজন দক্ষ, কঠোর ও দূরদর্শী গেরিলা কমান্ডার। তার সামরিক প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তা বিপ্লবীদের অনুপ্রেরণা জোগায়। বিশেষ করে, ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরে ‘ব্যাটল অফ সান্তা ক্লারা’-তে তার নেতৃত্বাধীন বাহিনীর অসামান্য বিজয় বাতিস্তা সরকারের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয় এবং বিপ্লবের পথ সুগম করে।

বিপ্লব সফল হওয়ার পর চে গুয়েভারা নতুন কিউবা রাষ্ট্র গঠনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি শিল্পমন্ত্রী, জাতীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এবং কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর ‘ইনস্ট্রাক্ষণাল ডিরেক্টর’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি যুগান্তকারী ভূমি সংস্কার আইন প্রবর্তন করেন এবং বিপ্লবী আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মতো কঠিন দায়িত্বও সামলান। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা চে-র বিপ্লবী আত্মা এক জায়গায় স্থির হতে পারেনি।

তিনি ছিলেন একজন তাত্ত্বিকও। তিনি বিশ্বাস করতেন ‘নতুন মানুষ’ (El Hombre Nuevo) গড়ার তত্ত্বে, যেখানে মানুষ বৈষয়িক লাভের ঊর্ধ্বে উঠে নৈতিকতা ও সামষ্টিক কল্যাণের জন্য কাজ করবে। তার বিশ্বাস ছিল, বিপ্লব কোনো ভৌগোলিক সীমায় আবদ্ধ থাকতে পারে না। তাই কিউবার মন্ত্রিত্ব, সম্মান ও নাগরিকত্ব ত্যাগ করে তিনি পাড়ি জমান কঙ্গো এবং পরে বলিভিয়ার পথে, নতুন বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে দিতে।

১৯৬৭ সালের ০৮ অক্টোবর, বলিভিয়ার দুর্গম জঙ্গলে সিআইএ-এর প্রত্যক্ষ সহায়তায় বলিভিয়ান সেনাবাহিনীর হাতে তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় ধরা পড়েন এবং পরের দিন তাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে এক বিপ্লবীর দৈহিক মৃত্যু ঘটলেও জন্ম হয় এক কিংবদন্তির। ঘাতকের বুলেট তার শরীরকে স্তব্ধ করতে পারলেও তার আদর্শকে নিঃশেষ করতে পারেনি।

মৃত্যুর পরেও চে যেকোনো জীবন্ত মানুষের চেয়েও বেশি জীবন্ত। আলবের্তো কোর্দার তোলা তার ‘গেরিলেরো হেরোইকো’ (বীরোচিত গেরিলা) নামক ছবিটি আজও বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও অনুপ্রেরণাদায়ক ফটোগ্রাফগুলোর একটি। টাইম ম্যাগাজিনের চোখে তিনি বিংশ শতাব্দীর প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন। চে কেবল একজন গেরিলা নেতা বা কূটনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন লেখক, তাত্ত্বিক ও চিন্তাবিদ। তার লেখা ‘দ্য মোটরসাইকেল ডায়েরিজ’ বা বিভিন্ন প্রবন্ধ ও বক্তৃতা আজও বিশ্বজুড়ে বিপ্লবীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।

আল শাহারিয়া
কবি, লেখক, পরিবেশকর্মী ও কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *