কবীর সুমন ও বাংলা গানের নতুন যুগ

বাংলা সংগীতের ইতিহাসে কবীর সুমন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁকে নিয়ে আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা কেবল তাঁর কণ্ঠস্বরের মাধুর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলা গানের কাঠামোগত এবং বিষয়ভিত্তিক জায়গাগুলোতে তিনি এমন কিছু পরিবর্তন এনেছিলেন যা পূর্বের ধারা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে তাঁকে পাঠ করা বা বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। এর প্রধান কারণ হলো তিনি ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক সংগীতের প্রভাবকে স্থানীয় ভাষায় সুনিপুণভাবে রূপান্তর করতে পেরেছিলেন। তাঁর গানে নগরজীবনের জটিলতা, মানুষের প্রতিদিনের একাকীত্ব এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সরাসরি প্রকাশ ঘটেছিল। এসব কারণে বাংলা গানের বিবর্তনের ইতিহাস বুঝতে হলে কবীর সুমনের কাজগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

কবীর সুমন
কবীর সুমন; ছবি: সংগৃহীত
সংগীতের পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা

১৯৪৯ সালের ১৬ মার্চ উড়িষ্যার কটক শহরে তাঁর জন্ম হয় [উইকিপিডিয়া]। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয়েছিল সুমন চট্টোপাধ্যায়। পিতা সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং মাতা উমা চট্টোপাধ্যায় উভয়েই ছিলেন সংগীতের জগতের মানুষ। তাঁরা পেশাদার সংগীতজ্ঞ হিসেবে রেডিওতে নিয়মিত অনুষ্ঠান করতেন এবং তাঁদের গ্রামোফোন রেকর্ডও প্রকাশিত হয়েছিল [সববাংলায়]। এমন একটি সাঙ্গীতিক আবহে বেড়ে ওঠার কারণে শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ তৈরি হয়। পরিবারের এই সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত শক্তভাবে গড়ে দিয়েছিল।

সংগীতে তাঁর প্রথম হাতেখড়ি হয় বাবার কাছেই। বাবার নিবিড় তত্ত্বাবধানে তিনি শাস্ত্রীয় সংগীত, রবীন্দ্রসংগীত এবং বাংলা খেয়ালের প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে এই শিক্ষাকে আরও পরিণত করার সুযোগ তিনি পান। আচার্য কালীপদ দাস এবং চিন্ময় লাহিড়ীর মতো গুণী শিল্পীদের কাছে তিনি খেয়াল রপ্ত করেন। [উইকিপিডিয়া]। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। কলকাতার সেন্ট লরেন্স হাই স্কুলে বিদ্যালয় জীবন শেষ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ফরাসি ও জার্মান ভাষায় ডিপ্লোমাও করেন [উইকিপিডিয়া]।

বিশ্বপরিভ্রমণ ও অভিজ্ঞতার বিস্তার

প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। শুরুতে অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং ইউনাইটেড ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় সংক্ষিপ্ত সময় কাজ করেছিলেন [সুমনামি]। তবে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি দেশ ছেড়ে ইউরোপে পাড়ি জমান। জার্মান ইন্টারন্যাশনাল রেডিওর বাংলা বিভাগে দুটি পর্যায়ে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন এবং ১৯৮৯ সালে দ্বিতীয় চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে স্থায়ীভাবে কলকাতায় ফিরে আসেন [Roar বাংলা]। ইউরোপে থাকার এই পর্বেই ফ্রান্সে অবস্থানকালে প্রথমবারের মতো বব ডিলানের গান শোনেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল [সুমনামি]।

১৯৮০ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি আমেরিকায় বসবাস করেন এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগে কর্মরত ছিলেন [Roar বাংলা]। আমেরিকায় থাকার সময় পিট সিগার এবং মায়া অ্যাঞ্জেলোর মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ১৯৮৫ সালের দিকে পিট সিগারের মাধ্যমে নিকারাগুয়ার তৎকালীন সংস্কৃতিমন্ত্রী আর্নেস্তো কার্দেনালের আমন্ত্রণে নিকারাগুয়া ভ্রমণ করেন এবং ল্যাটিন আমেরিকার নতুন ধারার সংগীত বিপ্লব খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান [Roar বাংলা]। দীর্ঘ এই প্রবাস জীবনে বিশ্বের নানা প্রান্তের সংগীতের স্তর আত্মস্থ করেন তিনি, যা পরে বাংলা গানে নতুন মাত্রা যোগ করে।

‘তোমাকে চাই’ এবং বাংলা গানে নতুন ভোর

১৯৮৯ সালে কলকাতায় ফিরে শুরুতে ‘নাগরিক’ ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ শুরু করেন। এই ব্যান্ডের সঙ্গে তাঁর ‘অন্য কথা অন্য গান ১’ এবং ‘অন্য কথা অন্য গান ২’ প্রকাশিত হয় [Roar বাংলা]। পরবর্তীতে তিনি ‘সুমন দ্য ওয়ান ম্যান ব্যান্ড’ গঠন করেন, যেখানে তিনি নিজেই একমাত্র সদস্য [ইত্তেফাক]।

এরপর ১৯৯২ সালটি বাংলা সংগীতের জন্য ঐতিহাসিক হয়ে ওঠে। এই বছরে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত অ্যালবাম তোমাকে চাই। এই একটি এলব্যাম বাংলা গানের প্রচলিত ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয় [উইকিপিডিয়া]। শ্রোতারা অনুভব করলেন যে বাংলা গানও এত সরাসরি কথা বলতে পারে। নগরজীবনের প্রতিদিনের একাকীত্ব, প্রেমের ভিন্ন রূপ এবং রাজনৈতিক ক্ষোভ গিটারের তারে অকপটে প্রকাশ পেল। স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৩ সালে গোল্ডেন HMV তাঁকে ডিস্ক পুরস্কার প্রদান করে [সুমনামি]। বব ডিলানের বিখ্যাত Blowin’ in the Wind-এর বাংলা রূপান্তর কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায় শ্রোতাদের কাছে ডিলানকে নতুন মাত্রায় পরিচয় করিয়ে দেয় [Roar বাংলা]।

পড়ুন মহীনের ঘোড়াগুলি সম্পর্কে…
বহুমাত্রিক কাজের পরিধি

কবীর সুমন কাজের কাজের পরিধি কেবল গানে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি একাধারে গায়ক, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, কবি, সাংবাদিক, গদ্যকার, অভিনেতা এবং রাজনৈতিক কর্মী [উইকিপিডিয়া]। তাঁর স্বরচিত অ্যালবামের সংখ্যা পনেরোরও বেশি [উইকিপিডিয়া]। হাল ছেড়ো না বন্ধু, অভিবাদন, গানওয়ালা, দুনিয়াটা এবং তুমি ছিলে গানগুলো বাংলা সংগীতের স্থায়ী সম্পদ হয়ে উঠেছে।

চলচ্চিত্রের জগতেও তাঁর কাজ অত্যন্ত প্রশংসিত। সৃজিত মুখার্জির পরিচালনায় জাতিস্মর (২০১৩) চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার জন্য তিনি ২০১৪ সালে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। একই চলচ্চিত্রের জন্য মিরচি মিউজিক অ্যাওয়ার্ড বাংলায় শ্রেষ্ঠ সুরকার এবং শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবেও সম্মাননা লাভ করেন [উইকিপিডিয়া]। এর আগে ১৯৯৭ সালে ‘ভাই’ চলচ্চিত্রের জন্য বিএফজেএ পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ গীতিকারের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১৫ সালে তাঁকে ‘সংগীত মহাসম্মান’ পুরস্কারে ভূষিত করে [সুমনামি]। লেখক হিসেবেও তাঁর সুনাম রয়েছে। মুক্ত নিকারাগুয়া (১৯৮৭), আলখাল্লা (১৯৮৬), দূরের জানলা (১৯৯৭) এবং সুমনের গান সুমনের ভাষা (১৯৯৪) তাঁর উল্লেখযোগ্য বই [সুমনামি]। অভিনয়েও দক্ষতা দেখিয়েছেন অঞ্জন দত্তের ‘রঞ্জনা আমি আর আসবো না’ সহ একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন [ইত্তেফাক]।

লেখক: আল শাহারিয়া
পরিবেশবাদী লেখক, সংগঠক ও কলামিস্ট।
ব্লগ: al-sharia.com/author/sharia/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *