মহীনের ঘোড়াগুলি এবং আধুনিক বাংলা গানের উত্থান

আল শাহারিয়া
বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু নাম চিরকাল বিপ্লবের প্রতীক হয়ে থাকবে। মহীনের ঘোড়াগুলি সেইসব নামগুলির মধ্যে অগ্রগণ্য। সত্তর দশকের অস্থির সময়ে কোলকাতার বুকে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যে দুঃসাহসিক গানের দলের জন্ম হয়েছিল তার প্রভাব বাংলা আধুনিক গানের গতিপথকে চিরতরে পাল্টে দিয়েছে। মহীনের ঘোড়াগুলি একটি আন্দোলন যা সময়ের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে থাকা এক জীবনবোধের ফসল। তারা বাংলা গানকে রোমান্টিকতার চিরাচরিত কাঠামো থেকে মুক্ত করে নগর জীবনের ক্লেদ, হতাশা, রাজনীতি এবং অস্তিত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলো।

১৯৭০ এর দশকে বাংলা গানের জগতে একধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছিল। একদিকে রবীন্দ্র-নজরুল ও দ্বিজেন্দ্রলালের ক্লাসিক্যাল ধারা, অন্যদিকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীদের রোমান্টিক আধুনিক গান এবং বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের সুরের আধিপত্য। ঠিক সেই সময়ে বিশ্বজুড়ে ষাটের দশকের রক, জ্যাজ, ফোক ও ব্লুজের উত্থান ঘটে। রাজনীতি-সচেতন এবং নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত গৌতম চট্টোপাধ্যায় সেই সময়েই অনুভব করেন বাংলা গানের চিরায়ত ধারার পরিবর্তন প্রয়োজন। তার রাজনৈতিক আদর্শ, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং পাশ্চাত্য সঙ্গীতের গভীর জ্ঞান এক নতুন ধারার বীজ বপন করে।

জীবনানন্দ দাশের ঘোড়া কবিতা থেকে নেওয়া মহীনের ঘোড়াগুলি নামটি ছিল এক অসাধারণ নির্বাচন। এই ঘোড়ারা যেন একদল সংবিগ্ন তরুণ যারা প্রথাগত কাঠামোর বাইরে গিয়ে নতুন এক পথের সন্ধান করে। গৌতমের নেতৃত্বে সাতজন তরুণ শিল্পী এই ঘোড়াদের সারথি হন। প্রাথমিকভাবে ব্যান্ডটিতে সাত জন সদস্য থাকায় নাম ছিল ‘সপ্তর্ষি’। তাদের লক্ষ্য ছিল বাংলা গানকে সাধারণ মানুষের জীবনমুখী করে তোলা।

মহীনের ঘোড়াগুলির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল তাদের গানের কথা বা লিরিক্স। গৌতম চট্টোপাধ্যায় ও রঞ্জন ঘোষাল সহ অন্যান্য সদস্যদের লেখা গানগুলি ছিল সাহিত্যের গুণমানে সমৃদ্ধ, কাব্যিক এবং বিশ্লেষণধর্মী। তারা তাদের লেখায় প্রচলিত কাব্যিক ভাষা ব্যবহার না করে দৈনন্দিন জীবনের ভাষা, সমাজ ও রাজনীতির সরাসরি প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন।

বাম থেকে: রাজা ব্যানার্জী, প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, তাপস দাস, প্রণব সেনগুপ্ত, গৌতম চট্টোপাধ্যায় এবং রঞ্জন ঘোষাল। এব্রাহাম মজুমদার এবং বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায়

গানগুলিতে উঠে আসে কিছু গভীর দার্শনিক জিজ্ঞাসা। ‘সংবিগ্ন পাখিকূল ও কলকাতা বিষয়ক’ অ্যালবামের গানগুলি তৎকালীন কলকাতার অস্থির চিত্র তুলে ধরে। ‘পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে’ গানটিতে নগর জীবনের একাকীত্ব এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিঃসঙ্গ সমাজের প্রতি এক সূক্ষ্ম বিদ্রূপ ছিল। ‘হায় ভালোবাসি’ গানে স্বপ্ন দেখা সহজ সরল জীবনের প্রতি তাদের আকুলতা প্রকাশিত হয়েছিল। আবার ‘চৈত্রের কাফন’ বা ‘ঘরে ফেরার গান’ এর মতো গানগুলিতে ছিল বিপ্লবী চেতনার ছায়া এক হারানো স্বপ্নের খোঁজ। তারা কেবল প্রেম-বিরহ নিয়ে গান করেনি। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে রাজনীতি, দারিদ্র্য, অন্যায়-অবিচার ইত্যাদিকে গানের বিষয়বস্তু করে তুলেছিল। এই সাহস আর জীবনমুখী দর্শন আধুনিক বাংলা গানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে দেয়।

গানের কথায় নতুনত্ব আনার পাশাপাশি মহীনের ঘোড়াগুলি সুর ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারে এক বৈপ্লবিক নিরীক্ষা করেছিল। রক, ফোক, জ্যাজ ও লাতিন মিউজিকের ফিউশন বাংলা গানের চিরাচরিত সুরকে এক ধাক্কায় পাল্টে দিয়েছিল। গৌতম চট্টোপাধ্যায় নিজে স্যাক্সোফোন আর বেস গিটার বাজাতেন এবং তার হাতেই রক মিউজিক বাউল ও লোকসঙ্গীতের সঙ্গে এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছিল। গিটার, ড্রামস, কি-বোর্ড সহ ওয়েস্টার্ন ইনস্ট্রুমেন্টের সঙ্গে একতারা, বাঁশি বা ভায়োলিনের ব্যবহার ছিল তাদের সিগনেচার স্টাইল। এই লোক-রক ধারা বাংলার শ্রোতাদের কাছে ছিল একেবারেই অচেনা যা তাদের বাণিজ্যিক সাফল্য থেকে দূরে রাখলেও একটি মননশীল শ্রোতাগোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছিল।

তাদের এই পরীক্ষামূলক সুরই বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছিল। তারা দেখিয়েছিল আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার করেও মাটির গান করা যায়। এই ফিউশনধর্মী সুরের মাধুর্য এবং গানের কথার গভীরতা মহীনের ঘোড়াগুলিকে সময়ের ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে।

১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তাদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা ব্যর্থ বলা চলে। সেসময়ের বাণিজ্যিক বাংলা গানের ধারায় অভ্যস্ত শ্রোতারা তাদের গান গ্রহণ করতে পারেনি। তবে তাদের গানের দর্শন ও সুরের গভীরতা কিছু তরুণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। মহীনের ঘোড়াগুলি ভেঙে গেলেও তাদের গান হারিয়ে যায়নি। তাদের কাজ যেন বীজ হয়ে মাটির গভীরে লুকিয়ে ছিল, যা অনুকূল পরিবেশের অপেক্ষায় ছিল।

দীর্ঘ বিরতির পর নব্বইয়ের দশকে যখন পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ব্যান্ডের জোয়ার আসে, তখন মহীনের ঘোড়াগুলির গান নতুন করে আবিষ্কৃত হয়। এই নব্বইয়ের দশককে বাংলা ব্যান্ড সংগীতের নবজাগরণের সময় বলা হয়। আর এই নবজাগরণের কেন্দ্রে ছিল মহীনের ঘোড়াগুলির দেখানো পথ। কবির সুমন, নচিকেতা, অঞ্জন দত্তদের জীবনমুখী গান বা ক্যাকটাস, ফসিলস, চন্দ্রবিন্দুর মতো ব্যান্ডগুলির রক ফিউশন মহীনের ঘোড়াগুলির উত্তরাধিকারকে বহন করে চলেছে। তারা মহীনের ঘোড়াগুলির চর্চা করেই বুঝতে পারে যে বাংলা গানকে বিশ্বমানের করে তুলতে হলে নিজস্ব সংস্কৃতি ও সমকালীন জীবনবোধের সঙ্গে পশ্চিমা রকের সাহসী ফিউশন প্রয়োজন।

১৯৯৫ সালে গৌতম চট্টোপাধ্যায় যখন সমসাময়িক শিল্পীদের নিয়ে ‘আবার বছর কুড়ি পরে’ নামে একটি সংকলন প্রকাশ করেন, তখন মৃত প্রায় এই ব্যান্ডটি যেন নতুন করে প্রাণ পায়। এটি মহীনের ঘোড়াগুলির সম্পাদিত লেখা হলেও তরুণ শ্রোতারা এই গানগুলিকেই মহীনের ঘোড়াগুলির গান হিসেবে গ্রহণ করে। এইভাবেই গৌতম চট্টোপাধ্যায় তার ব্যক্তিগত ও দলীয় সৃষ্টিকে একত্রিত করে একটি প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়েছিলেন যা বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে।

মহীনের ঘোড়াগুলি প্রমাণ করেছিল যে শিল্পকে আপোস না করেও টিকিয়ে রাখা যায়। তারা শিখিয়েছিল জনপ্রিয়তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো শিল্পীর স্বকীয়তা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। আজ মহীনের ঘোড়াগুলির গান শুধু কলকাতার কলেজ-ক্যান্টিন বা রাস্তার মোড়ে নয়, বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে এক আবেগের নাম। তাদের গান সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও প্রাসঙ্গিক। শেষের কবিতার অমিত রায় যেমন বলেছিলেন “কালের কষ্টিপাথরে যা টিকে যায় তাই আধুনিক” সেই বিচারে মহীনের ঘোড়াগুলিই আধুনিক বাংলা গানের প্রকৃত প্রবক্তা। তারা কেবল কিছু গান সৃষ্টি করেনি তারা বাংলা ব্যান্ডকে একটি ভিত্তিভূমি দিয়ে গেছে। এই ঘোড়াদের পদধ্বনি আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে তাদের নিজস্ব পথ খুঁজে নিতে প্রেরণা যোগায়।

লেখক: আল শাহারিয়া
কবি, কলামিস্ট ও পরিবেশবাদী লেখক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *