জলবায়ু শরণার্থী হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিন

খুলনার ডুমুরিয়া-বটিয়াঘাটা উপজেলা পৃথককারী শোলমারী নদীতে এখন কোনো পানির প্রবাহ নেই বললেই চলে। নদীটি ডুমুরিয়া উপজেলার রংপুর ইউনিয়নের বিলাঞ্চল হতে উৎপত্তি লাভ করে বটিয়াঘাটা উপজেলার প্রবহমান কাজিবাছা নদীতে নিপতিত হয়েছে। একসময় শোলমারী নদীতে দাপুটে স্রোত ছিল [১]। এখন পলি পড়ে ভরাট হয়ে নদীটির প্রাণ যায় যায় অবস্থা। দখল আর অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে একসময়ের দেড়’শ মিটার প্রশস্ত শোলমারী কালের পরিক্রমায় পরিণত হয়েছে দুই থেকে তিন মিটার সরু নালায়। ভাটায় এখন নদীতে নৌকা চালানো যায় না। হেঁটেই পার হয় মানুষ। এই জুনের শুরু পর্যন্তও সামান্য হাঁটুপানি দৃশ্যমান এই নদীতে। কিন্তু হুট করে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলে নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসরত লোকজনের জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে। প্লাবিত হয় বাড়ি-ঘর, পুকুর, ঘেরসহ যা যা আছে। এসবের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদের আসলে কেমন?

ছবি- সংগৃহীত

বাস্তুচ্যুত হওয়া বা রিফিউজি শব্দটা শুনলে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো দেশের বীভৎস ছবি। আমরা ভাবি কাঁটাতারের বেড়া আর অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরের দৃশ্য। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিন রিফিউজি হচ্ছে তাদের কোনো নির্দিষ্ট শিবির নেই। তাদের বুকে কোনো বুলেট বিদ্ধ হয়নি। কিন্তু প্রকৃতির রুদ্ররোষ তাদের ভিটামাটি কেড়ে নিয়েছে। তারা ছিন্নমূল হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে শহরে। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোর উপান্তে বস্তিগুলোতে প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষের ভিড় বাড়ছে। এরা কারা? এর বেশিরভাগই জলবায়ু শরণার্থী। নদীভাঙনে বা লবণাক্ততার কারণে নিজের সহায় সম্বল হারিয়ে উপকূলের অনেক মানুষ বাধ্য হয়েছে অনিশ্চিত শহরে পাড়ি জমাতে।

সংখ্যাগুলো দেখলে বোঝা যায় এই ক্ষতি কতটা গভীর। ২০২২ সালে একটি বছরেই দুর্যোগের ফলে বাংলাদেশে ৭১ লক্ষের বেশি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে [২] । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানাচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ আরও ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুতির শিকার হতে পারে। [৩] । ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি সাতজনের মধ্যে একজন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হবে [৪] ।

এর পেছনের কারণ কিছুটা ভৌগলিক। বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব সামান্যই উঁচুতে [৫] । আর এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকাতেই বাস করছে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ [৬] । বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রের জলস্তর ক্রমাগত বাড়ছে। যার অর্থ হলো ভূমি কমছে, মানুষ বাড়ছে এবং পালানোর জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে।

সবচেয়ে নিঃশব্দ ঘাতকটির নাম লবণ। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বাতাসে এক অদ্ভুত নোনা গন্ধ মিশে থাকে। আমার মতো যারা এই নোনা বাতাসের মধ্যে জন্ম নিয়েছে এবং বড় হয়েছে তারা খুব কাছ থেকেই দেখেছে নদীর পানির রূপবদল এবং প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর আচরণ। বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে যে, সামনের দিনগুলোতে উপকূলের মাটি আরও বেশি লবণাক্ত হয়ে পড়বে [৭]। এর ফলে ধানের ফলন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাবে [৮]। কৃষিতে এই বিপর্যয়ের সরাসরি প্রভাব পড়বে মানুষের জীবনে, আর কাজের খোঁজে গ্রাম ছেড়ে শহরে পালানো মানুষের সারি আরও দীর্ঘ হবে।

সোনালী ধান ফলা জমিতে এখন থৈ থৈ করছে বিষাক্ত নোনা পানি। লবণসহিষ্ণু জাত চাষ করে ধানের আবার কিছুটা ফেরানো গেলেও অন্যান্য শস্য চাষ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আশির দশকের পর থেকে আমাদের এই উপকূলীয় অঞ্চলে শুরু হলো চিংড়ি চাষের এক আগ্রাসী থাবা। যাকে সবাই অত্যন্ত আদর করে ডাকতে শুরু করল সাদা সোনা বলে। এই সাদা সোনায় রাতারাতি বড়লোক হওয়ার এক অন্ধ স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমরা নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুড়াল মারলাম। বেশি লাভের আশায় ইচ্ছে করে নোনা পানি ঢোকানো হলো আবাদি ফসলের মাঠে। এটাকে ট্র্যাপ করে রাখার অনুশীলন এই অঞ্চলে খুবই স্বাভাবিক এখন। ফলে স্যালিনিটি ইন্ট্রুশন চরম মাত্রায় বেড়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো বাস্তুসংস্থানকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিয়েছে। মাটির লবণাক্ততা এত বেশি মাত্রায় বেড়ে গেছে যে সেখানে এখন একটা সাধারণ ঘাসও জন্মায় না। মিঠা পানির অভাবে খাঁ খাঁ করছে চারপাশ। এত পানি চারপাশে কিন্তু এক ফোঁটাও পানযোগ্য নয়।

জলবায়ু শরণার্থী বললেই আমাদের চোখের সামনে শুধু উপকূলের নোনা জলের দৃশ্য ভেসে ওঠে। কিন্তু বাস্তুচ্যুতির এই ভয়াবহ মানচিত্র কেবল দক্ষিণাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই। উত্তরের তিস্তা বা ব্রহ্মপুত্রের করাল গ্রাসও প্রতিদিন হাজারো মানুষকে পথে বসাচ্ছে। রাতের অন্ধকারে আস্ত একটা গ্রাম নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার দৃশ্যগুলো সেখানে খুব সাধারণ ঘটনা। রংপুর বা কুড়িগ্রামের মতো এলাকার নদীপাড়ের মানুষেরা চোখের সামনে নিজের শেষ সম্বলটুকু ভাসিয়ে দিয়ে পরদিন সকালে শহরের ট্রেনে উঠছে। আবার উত্তর পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকার মানুষের জীবনও এখন চরম অনিশ্চিত। পাহাড়ি ঢল আর অকাল বন্যায় চোখের সামনে সোনালী ধান তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য তাদেরও শহরমুখী হতে বাধ্য করছে। ভৌগোলিক অবস্থান ভিন্ন হলেও দিনশেষে এরা সবাই জলবায়ুরই শিকার।

এই বাস্তুচ্যুতির পেছনে আরেকটা বড় কারণ হলো আমাদের চিরচেনা কৃষির বিপর্যয়। আবহাওয়ার অদ্ভুত আচরণ আর খামখেয়ালিপনায় প্রান্তিক কৃষকরা এখন সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। হঠাৎ বন্যা খরা বা অসময়ের বৃষ্টির কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে টিকতে না পেরে বাধ্য হয়ে তারা যখন বাবা-দাদার কৃষিকাজ ছেড়ে শহরের রিকশার হ্যান্ডেল ধরছেন তখন তাদের জীবনের গল্পটাও বদলে যায়। একবার গ্রাম ছেড়ে শহরে এলেই কি তাদের সংগ্রাম শেষ হয়। একেবারেই নয়। শহরের যেসব নিচু বস্তিতে তারা কোনোমতে আশ্রয় নেন সামান্য বৃষ্টিতেই সেগুলো ডুবে যায়। অর্থাৎ একজন জলবায়ু শরণার্থীকে তার জীবনে কেবল একবার নয় বরং বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার এই নিষ্ঠুর চক্রের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ভিটেমাটি হারানোর সাথে সাথে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং লোকায়ত পরিচয়গুলোও এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে চিরতরে।

ঢাকায় প্রতি বছর গড়ে কয়েক লাখ করে মানুষ বাড়ছে [৯] । এদের বেশিরভাগই শহরের অস্বাস্থ্যকর বস্তিগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন [১০] । শহরে আসা এই অভিবাসীরা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার সীমিত সুযোগের মধ্যে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বাস করে। গ্রামের সংকট থেকে পালিয়ে শহরে এসে তারা পড়ছেন নতুন, ভিন্ন সংকটে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনে এই মানুষগুলোর কোনো পরিচয় নেই। ১৯৫১ সালের জাতিসংঘ শরণার্থী কনভেনশন কেবল রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকারদের সুরক্ষা দেয়। জলবায়ু শরণার্থীর কোনো আইনি সংজ্ঞা নেই, সুরক্ষা নেই, ক্ষতিপূরণের কোনো প্রক্রিয়া নেই। তারা ছিন্নমূল হয়ে পড়ছেন, কিন্তু বৈশ্বিক ব্যবস্থার চোখে তারা দৃশ্যমান নন।

এই বিপুল মানবিক মূল্য দিতে হচ্ছে এমন একটি দেশকে, যার বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে অবদান এক শতাংশেরও কম। যারা সংকট তৈরি করেছে, তারা কিছু নামমাত্র ফান্ডিং করে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে অবলীলায়। বিত্তশালী এবং আন্তর্জাতিক এনজিওরা এয়ার কন্ডিশনারের ঘরে বসে সমাধান খুঁজছেন। আর যারা কিছুই করেনি, তারা ভিটা ছেড়ে পথে হাঁটছে।

শোলমারী নদীর পাড়ের মানুষেরা এখনও আছেন। কিন্তু তারা জানেন, বেশিদিন থাকা যাবে না। সামনে ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম, নদীতে পানি বাড়লে তা লোকালয়ে প্রবেশ করবেই। পরের জোয়ারে না হলেও পরের ফসলহানির বছরে তারাও যোগ দেবেন সেই দলে, যে দলের স্বীকৃত কোনো নাম নেই, নেই কোনো আন্তর্জাতিক সুরক্ষা। জলবায়ু শরণার্থী হওয়ার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রস্তুত হতে হবে- জনে জনে, গ্রামে গ্রামে। প্রশ্ন হলো, বিশ্ব কি এটা দেখছে?

লেখক: আল শাহারিয়া
পরিবেশবাদী লেখক, সংগঠক ও কলামিস্ট।

তথ্যসূত্র:

১.  https://www.prothomalo.com/photo/bangladesh/88i2mep1hb

২. https://bangla.thedailystar.net/environment/climate-change/news-422426

৩. https://www.who.int/news/item/28-11-2022-focus-on-capacity-building-at-who-s-global-school-on-refugee-and-migrant-health-in-dhaka

৪. https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S2405844020318612#sec3

৫. https://www.worldbank.org/en/news/press-release/2012/11/20/new-report-examines-risks-of-4-degree-hotter-world-by-end-of-century-bangladesh-among-most-vulnerable-countries-to-face-sea-level-rise

৬. https://www.researchgate.net/publication/396450929_Coastal_Population_and_Livelihood_in_Bangladesh

৭. https://www.thedailystar.net/environment/climate-change/news/sea-level-rise-bangladesh-faster-global-average-3613116

৮. https://www.worldbank.org/en/news/feature/2022/10/31/key-highlights-country-climate-and-development-report-for-bangladesh

৯. https://openknowledge.worldbank.org/entities/publication/8d0cc4ec-8e1c-54ec-9630-e7ac5e4aa34b

১০. https://www.prothomalo.com/bangladesh/capital/axiwtt902p

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *