প্রতিদিন সকালে সংবাদপত্রের পাতা ওল্টালেই বা মুঠোফোনে স্ক্রল করলেই সামনে আসে বজ্রপাতে মৃত্যুর খবর। পরিসংখ্যান বলছে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় তিনশো মানুষের মৃত্যু হয় বজ্রপাতে। গত পনেরো বছরে এই মৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে চার হাজার ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যুহার বেশি। নিহতদের প্রায় সত্তর ভাগই হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষক। যারা আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেন প্রকৃতির এই ভয়াল রোষের শিকার কেন তারাই সবচেয়ে বেশি হচ্ছেন? এর পেছনে বেশ কয়েকটি যৌক্তিক এবং ভৌগোলিক কারণ রয়েছে।
বজ্রপাতের একটি সাধারণ বৈজ্ঞানিক নিয়ম রয়েছে। সেটি হলো ফাঁকা জায়গায় থাকা সবচেয়ে উঁচু বস্তুর ওপর এটি আঘাত হানে। আমাদের দেশের কৃষকরা মূলত বিস্তীর্ণ এবং সমতল ফসলের মাঠে কাজ করেন। একটি বিশাল ফাঁকা মাঠে কাজ করার সময় সেখানে কোনো উঁচু গাছ বা স্থাপনা থাকে না।

ফলে সেই খোলা প্রান্তরে কৃষক নিজেই সবচেয়ে উঁচু বস্তুতে পরিণত হন। মেঘ থেকে নেমে আসা প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক শক্তির আঘাত তাই সরাসরি কৃষকের শরীরের ওপর এসে পড়ে। তাছাড়া কৃষকদের হাতে কাস্তে বা নিড়ানির মতো ধাতব যন্ত্রপাতি থাকে। এগুলো বিদ্যুৎ পরিবাহী হওয়ায় বিপদের ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। আবহাওয়া ও কৃষির মৌসুমের একটি নির্মম সমাপতন এখানে কাজ করে। আমাদের দেশে এপ্রিল থেকে জুন মাসে কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাত সবচেয়ে বেশি হয়। এই সময়ের ভয়াবহতা সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়। ২০২৬ সালের মে মাসের শুরু পর্যন্ত বাংলাদেশে বজ্রপাতে অন্তত ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
শুধুমাত্র এপ্রিলের শেষের দিকে একদিনেই চৌদ্দজন কৃষক ও শ্রমিক ধান কাটার সময় বজ্রপাতে মারা যান। ঠিক এই সময়েই হাওর ও অন্যান্য অঞ্চলে বোরো ধান কাটার ধুম পড়ে যায়। সারা বছরের খোরাক এবং ঘাম ঝরানো ফসল ঘরে তোলার জন্য কৃষকরা এই সময়টায় মরিয়া থাকেন। আকাশে কালো মেঘ জমলেও তারা মাঠ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে চান না। জীবনের চেয়ে ফসলের মায়া এবং অভাবের তাড়না তাদের খোলা মাঠে থাকতে বাধ্য করে। ফলত বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যুহার বেশী হচ্ছে।
সচেতনতার অভাব এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ঘাটতি মূলত এই মৃত্যুহার বাড়িয়ে দিচ্ছে। বজ্রপাতের সময় করণীয় সম্পর্কে প্রান্তিক কৃষকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছায় না। তাছাড়া খোলা মাঠে হঠাৎ ঝড়বৃষ্টি শুরু হলে কৃষকদের লুকিয়ে বাঁচার মতো কোনো পাকা ছাউনি থাকে না। উন্নত দেশগুলোতে বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের দেশে সেই প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারেনি। মাঠে কোনো বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়নি।
বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো ’30-30 rule’। এই নিয়ম দু’টি ধাপে কাজ করে। বজ্রপাতের আলো দেখামাত্র সেকেন্ড গণনা শুরু করতে হবে। ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বজ্রধ্বনি শোনা গেলে বুঝতে হবে বজ্রঝড় একদম কাছে রয়েছে। তখনই মাঠের কাজ বন্ধ করে ঘরের ভেতরে আশ্রয় নিতে হবে। এবং শেষ বজ্রধ্বনি শোনার পরেও অন্তত ৩০ মিনিট ঘরে অবস্থান করতে হবে।
বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও বজ্রপাতের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলে মেঘের ঘর্ষণ বেশি হচ্ছে। এতে আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী বজ্রপাত সৃষ্টি হচ্ছে। এই পরিবর্তিত বিরূপ আবহাওয়ার প্রথম এবং প্রধান শিকার হচ্ছেন উন্মুক্ত মাঠের কৃষকরা। কৃষক বাঁচলে এই দেশ বাঁচবে। তাই কৃষকদের এই অকাল মৃত্যু ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। হাওর ও বিস্তীর্ণ কৃষি এলাকায় নির্দিষ্ট দূরত্বে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বা ছাউনি নির্মাণ করা জরুরি। পাশাপাশি বজ্রপাতের পূর্বাভাস কৃষকের মুঠোফোনে বা কাছাকাছি কোনো কেন্দ্রে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে কৃষক দ্রুতই ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে পারে।
লেখক: আল শাহারিয়া
পরিবেশবাদী লেখক, সংগঠক ও কলামিস্ট।
ব্লগ: al-sharia.com/author/sharia/
