সত্যজিৎ রায়— সেলুলয়েডের ক্যানভাসে এক রেনেসাঁস মানব

আল শাহারিয়া

বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় চলচ্চিত্রের কথা উঠলে অবধারিতভাবেই সবার আগে উচ্চারিত হয় যার নাম তিনি সত্যজিৎ রায়। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর পৌত্র এবং সুকুমার রায়ের সন্তান হিসেবে উত্তরাধিকার সূত্রেই তিনি পেয়েছিলেন এক বিরল মেধা। তিনি ছিলেন একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, লেখক, সুরকার, চিত্রশিল্পী, প্রচ্ছদশিল্পী এবং একজন আদ্যোপান্ত রেনেসাঁস মানুষ।

১৯৫৫ সাল। মুক্তি পেল পথের পাঁচালী। আর সেই সঙ্গেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রচিত হলো এক নতুন অধ্যায়। এর আগে ভারতীয় সিনেমা বলতে বিশ্ববাসী বুঝত কেবল নাচ, গান আর মেলোড্রামায় ভরপুর কিছু অবাস্তব গল্প। কিন্তু বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিতের এই সেলুলয়েড-কাব্য গোটা বিশ্বকে চমকে দিল। কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট’ পুরস্কার জিতে নিয়ে পথের পাঁচালী প্রমাণ করল, সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নাও কতটা শৈল্পিক ও আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে পারে।

Satyajit Ray; Illustration: Anika Tahsin Hafsa

এই ছবি তৈরির নেপথ্যের সংগ্রামও এক মহাকাব্য। অর্থাভাবে স্ত্রীর গয়না বিক্রি করা, দিনের পর দিন শ্যুটিং বন্ধ থাকা, এসব প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি নিজের ভিশনে স্থির ছিলেন। এরপর অপরাজিত এবং অপুর সংসার, এই তিনটি ছবি মিলে তৈরি হলো অপু ট্রিলজি, যা আজও বিশ্বের সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রগুলোর তালিকায় সগৌরবে বিরাজমান। জাপানি কিংবদন্তি পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন,

“সত্যজিতের সিনেমা না দেখা আর পৃথিবীতে বাস করে চন্দ্র-সূর্য না দেখা একই ব্যাপার।”

সত্যজিৎ রায়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর ডিটেইলিং-এর প্রতি অসীম মনোযোগ। তিনি শুধু ক্যামেরার পেছনের নির্দেশক ছিলেন না; নিজের ছবির চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে, পোশাক পরিকল্পনা, সেট ডিজাইন, এমনকি গান রচনাতেও তাঁর নিজস্ব স্পর্শ থাকত।

গ্রামবাংলার আটপৌরে জীবন থেকে বেরিয়ে এসে সত্যজিৎ যখন শহুরে জীবনের জটিলতা নিয়ে ছবি বানালেন, সেখানেও তিনি সমান পারদর্শী। মহানগর, নায়ক কিংবা তাঁর বিখ্যাত ক্যালকাটা ট্রিলজি (প্রতিদ্বন্দ্বী, সীমাবদ্ধ, জন অরণ্য) এর প্রতিটি ফিল্মেই ফুটে উঠেছে মধ্যবিত্ত সমাজের টানাপোড়েন, বেকারত্ব, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সর্বোপরি মানুষের ভেতরের অন্তর্দ্বন্দ্ব।

তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় দর্শন ছিল মানবতাবাদ। তাঁর কোনো ছবিতেই কোনো চরিত্রকে তিনি পুরোপুরি সাদাকালো বা কেবল ভালো-মন্দের ছাঁচে ফেলেননি। জলসাঘর-এর ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বিশ্বম্ভর রায়ের পতন বা শতরঞ্জ কি খিলাড়ি-তে ব্রিটিশ আগ্রাসনের মুখে নবাবদের নিষ্ক্রিয়তা, সবকিছুর পেছনেই মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে তিনি পরম মমতায় ও সূক্ষ্মতায় তুলে ধরেছেন।

চলচ্চিত্রের বাইরে সাহিত্য জগতেও তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। বাংলা সাহিত্যে তিনি জন্ম দিয়েছেন ফেলুদা এবং প্রফেসর শঙ্কু’র মতো কালজয়ী চরিত্র। ফেলুদার মগজাস্ত্রের ধার আর শঙ্কুর বৈজ্ঞানিক ফ্যান্টাসি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালি পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে। গুপী গাইন বাঘা বাইন বা হীরক রাজার দেশে-এর মতো ছবিতে তিনি তুলে ধরেছেন সমসাময়িক রাজনীতির এক শাণিত ব্যঙ্গ, যা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক সবার কাছেই সমান আবেদনময়।

জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে ১৯৯২ সালে তিনি লাভ করেন সম্মানসূচক অস্কার। মৃত্যুর শয্যায় শুয়ে অস্কারের মূর্তি হাতে তাঁর সেই হাসিমুখের ছবি আপামর বাঙালির কাছে এক পরম গর্বের মুহূর্ত। এর পাশাপাশি তিনি পেয়েছেন ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান লিজিয়ন অফ অনার এবং ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারতরত্ন।

সত্যজিৎ রায়কে কেবল একজন বাঙালি বা ভারতীয় সীমাবদ্ধতায় আটকে ফেলা যাবে না, তিনি ছিলেন একজন বিশ্বনাগরিক। তাঁর ক্যামেরা মানুষের আত্মার গভীরে প্রবেশ করতে জানত। চিরকালীন ধ্রুপদী এই শিল্পী বিশ্বের অন্যতম উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক দূত হিসেবে বেঁচে থাকবেন মানুষের মাঝে, নাগরিক ব্যস্ততায় বা ফেলুদা’র তীক্ষ্ণ চোখে।

লেখক: আল শাহারিয়া
কবি, কলামিস্ট ও পরিবেশবাদী লেখক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *